1. yellowhost.club@gmail.com : Tara Bangla News :
  • সোমবার, ২৭ জুন ২০২২, ০২:১৫ পূর্বাহ্ন

এক পুরুষে করে ধন-এক পুরুষে খায় ….………. তিন পুরুষ!!

  • আপডেট: বৃহস্পতিবার, ১৫ এপ্রিল, ২০২১
  • ২৪২

১.
ছাত্র জীবনের একটা ঘটনাই বলি।
তখন আমি অনার্সের ছাত্র। টগবগে রক্ত। ঔদ্ধত্যপূর্ণ কোনো ঘটনাই ঘটাইনি কোনদিন। কু-রাজনীতির কবলেও কখনো জড়াইনি নিজেকে। তবে অনেক সমস্যার সমাধান করার চেষ্টা করতাম। এক রমযানের ঈদে মসজিদ বিষয়ক একটি সমস্যার সমাধান করতে গিয়েই সমাজের কিছু বদমাইশের যাঁতাকলে পিষ্ট হতে নিয়েছিলাম। সেটি নিয়ে মেল দরকার, এমনকি কোট-কাচারিও মাড়াতে হয়েছে আমার সকল সহযোদ্ধাদের। দশ গ্রামের চেয়ারম্যান আর বিচারিদের নিয়ে খোলা মাঠে মাইক লাগিয়ে বিচার হলেও সেদিনও এই ফ্যামিলি রিপুটেশনের কারনেই আমার নামটি একবারো উল্লেখ করতে পারেনি কেহ। যদিও সেদিনের এই মহা বিচার যজ্ঞে আমার সহযোদ্ধাদেরই বিজয় হয়েছিল। আলহামদুলিল্লাহ

২.
মাত্র ২২ বছর বয়সেই প্রাইমারিতে যোগদান করি। কোন বিদ্যালয়ে পোস্টিং নিবো বুঝতে পারিনি। সেদিন ডিপিইও অফিসে একজন মুরব্বিকে জিজ্ঞেস করতেই উনি প্রশ্ন — ছুঁড়ে দিলেন তোমার বাড়ি কই?
— নাংগলকোট, পেরিয়া।
তুমি কি ইউনুছ মৌলভীর ছেলে নাকি?
— (আর যাই কই!) জ্বী।
তোমার আব্বা আমার খুব ভাল বন্ধু ছিল। তাজু তো প্রিন্সিপাল হইছে, সেলিম কী করে? রফিক কী করে? শুরু……….!!!
কোন স্কুলে পোস্টিং পেলাম আগের দিন স্কুল পরিদর্শন করতে গিয়েছিলাম। অপরিচিত লোকের আনাগোনা দেখে কয়েকজন জিজ্ঞেস করলো, আপনার পরিচয়?
এই স্কুলে নতুন নিয়োগ পেয়েছি। ইনশা আল্লাহ আগামীকাল থেকেই এখানে…..।
নতুন জেনেই প্রাক্তন প্রধান শিক্ষকের কাছে নিয়ে গেলেন। আপ্যায়নের ফাঁকে পরিচয় জিজ্ঞেসার জবাবের মাঝখানেই চমকে উঠে আপনি কি তাহলে আমাদের…..!!!
— জ্বী।
মাশা আল্লাহ। আলহামদুলিল্লাহ। তুমি কোন দুশ্চিন্তা করোনা। তোমার থাকা খাওয়ার কোন সমস্যা হবেনা। আমার বাড়িওই তোমার বাড়ি মনে করে দুপুরে খেতে যাবে। আরো কত কি!!!
এর পর থেকে ঐ এলাকার যত শিক্ষক- মুরব্বিই বিদ্যালয়ে আসতো আব্বার পরিচয় পেলেই বুকে জড়িয়ে নিতো। দোয়া করতো।
আসলে সেদিনও এই বাবার পরিচয়ই বেশি সম্মানিত, ভালবাসা, সহযোগিতা পেয়েছি।

৩.
পাঁচ বছর পর স্কুল পরিবর্তন। টি. নিশিন্তপুর সপ্রাবি। পাশের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রাইমারি পড়েছি। একবার ফুটবল খেলার উচিলায় এই বিদ্যালয়ের মাঠে এসেছিলাম। দ্বিতীয় বার শিক্ষক হয়ে।
বিদ্যালয়ের পাশেই ফুফুদের বাড়ি। মায়ের সাথেই বেশি যাওয়া হয়েছে। একা কখনো গিয়েছি মনে পড়েনা। আর বিদ্যালয়টা সম্পর্কে ভয়ংকর কিছু রটনা জানতাম বলেই কখনও ফিরেও তাকাতাম না।
গ্রামটা দারিদ্র্যের আতুড়ঘর। আসমানিদের বাড়ি মনে হয় এমন গ্রামেই ছিল। দাদা দুই মেয়েকেই এই গ্রামেই বিয়ে দিয়েছিলেন। উনারা সম্ভ্রান্ত ছিল।
শিশু বয়সেই গ্রাম ছেড়েছি বলেই এলাকার মুরব্বীরা তেমন চিন্তই না। তাছাড়া গ্রামটি আমাদের পার্শ্ববর্তী হলেও বাম না থাকায় আমাদেরও তেমন যাওয়াই পড়তো না।
যোগদানের পর পরই অসংখ্য মুরব্বিরা এসেছিল দেখা করতে। মনে হচ্ছিল, দাদার নুনের প্রতিদান দিতেই দৌড়ে আসা। তোমার দাদা এ করেছে, সে করেছে। রি এলাকার যত মানুষ অসুস্থ হতো আমরা চিক্কা আর টুল ফিয়ে ভারায়ে তোমাদের উঠানে নিয়ে ফেলে আসতাম। তোমার দাদা-ই তাদের মালিপাড়ার রুস্তম ডাক্তারের বাড়ি নিয়ে চিকিৎসা করায়ে আনতো। এমন হাজারো গুণকীর্তন। সাত বছর দাদার সম্মানেই অত্যন্ত সম্মানের সাথে পার করেছি। এলাকার আলহামদুলিল্লাহ।
[ একটা কুলাঙ্গারের কারণেই নিজেকে নিজের আত্মসম্মানবোধ রক্ষায় বিদ্যালয়টি ছেড়েছি। এ বিষয়ক একটি লেখা চলমান। ইনশা আল্লাহ ]।

৪.
বড় সাঙ্গিশ্বর সপ্রাবি। ২০১৬ সাল। এলাকার একটি আদর্শ গ্রাম। শিক্ষকদের গ্রাম। এই গ্রামেই জন্মেছিলেন এলাকার জন্যে আল্লাহর বিশেষ উপহার এ বি এম আহসান উল্লাহ মজুমদারের মতো মহা মনীষীর। যাঁর উচিলায় আমার আব্বাও শিক্ষকতার নেয়ামত ভোগ করেছেন। এমনি হাজারো শিক্ষকের শিক্ষা,রুটি – রুজির ব্যবস্থা হয়েছিল। এ গ্রামের কাঁদা মাটির গন্ধ আমার গায়ে এখনো বেরিয়ে আসে। শিশুকালে এই গ্রামেরই সাজুর মায়ের মেহমানদারির দৃশ্য এখনো চোখে ভাসে। মায়ের সাথে রিকসার পাদানিতে রড ধরে ঘিরনীর নিচে বসে মাটির দিকে চেয়ে দেখতাম মাটিগুলো পিছনে চলে যাচ্ছে। অদৃশ্য দেখতে দেখতে সাথে রিকশা ড্রাইভার কালা মিয়ার পিঠের কী সুন্দর আঁকাবাঁকা সাপের মতো ঘাম গড়িয়ে পড়ার দৃশ্য দেখতে দেখতে এই গ্রামে। উচিলা বড় ভাই। প্রিন্সিপাল আ ন ম তাজুল ইসলাম। উনার ছাত্র বয়সের অনেকটা সময় এই গ্রামেই কেটেছিল। এই গ্রামের প্রিন্সিপাল কাউছার ভাইয়ের সাথেই উনার রক্তের চাইতেও বেশি ঘনিষ্ঠতা ছিল। আল্লাহ কাউছার ভাইকে জান্নাতুল ফেরদৌসের মেহমান বানিয়ে রাখুক। আমীন।
আলহামদুলিল্লাহ
আজকের দিনেও এই বিদ্যালয়ে কারো ছোট ভাই, কারো ছেলে, কারো স্নেহভাজন, কারো আদর্শ হিসেবেই কালাতিপাত করছি। প্রতিটা দিনই মেহমানের মতোই কাটাচ্ছি। ভাইয়ের রেপুটেশন ধরে রাখার চেষ্টা করে যাচ্ছি। বাকীটা আল্লাহর ইচ্ছা।

৫.

১২ বৎসর বড় ভাইয়ের শহরে কাছাকাছি থাকছি। তিনিই এ শহরে চলে আসার জন্যে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন। ২০১১ সালের ২৩ জানুয়ারি নিজ হাতে গাড়ি থেকে মালামাল নামিয়ে শুধু অতটুকু বলে গেছেন, ” আজ রেখে গেলাম আরেকবার আসবো বাড়ি ফিরিয়ে দিতে। মাঝখানে যে কোন দিন মেল বিচারের জন্যে আসতে না হয়।”
আলহামদুলিল্লাহ
আজো ভাইকে দরকার পড়েনি। ভাইয়ের অদৃশ্য হাত সারাক্ষণ মাথার উপরে থাকে। কখনো গালেও। তাই প্রতি সেকেন্ড সাবধানে থাকার চেষ্টা করি। এই শহরের প্রতিটি বালু কণাও ভাইকে চিনে সম্মান দেয়। এই শহরে আমি আরো বিশ বছরেও নিজের পরিচয়ে পরিচিত হতে পারব কিনা জানিনা। যা একটু তাজু হুজুরের ছোট ভাই!

৬.
আসলে আমার জগত অনেকটাই ভার্চুয়াল নির্ভর। আই মীন আপনারা। বাকী অংশ আমার কলিজার টুকরাগুলো ছাত্র-ছাত্রী। দুই হাত ভরে দোয়ায় একদিন আমার পরিচয়েও আমার সন্তানেরা পরিচিত হতে পারবে।
আজ আমি হয়ত আমারটা কলমে তুললাম। আপনারাও তুললে আরো সুন্দর হবে। আসলে আমাদের পূর্ব পুরুষরাই আমাদের দিক-দর্শণ। উনারা করে গেছেন আমরা ভোগ করছি।
আর আমরা…….???

 

লেখক: ফখরুল ইসলাম

সহকারি শিক্ষক, বড় সাঙ্গিশ্বর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়

নিউজটি শেয়ার করতে পারেন....

এই ক্যাটাগরির আরো নিউজ...